
বরিশালের হিজলা উপজেলার মেঘনা নদীতে চাঁদপুর নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানের সময় সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় আক্তার হাওলাদার (৪০) নামে এক জেলের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচ জেলে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত ব্যক্তিরা ভয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর), ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আক্তার হাওলাদার হিজলা উপজেলার মেমানিয়া ইউনিয়নের ৮ নং চরমেমানিয়া গ্রামের মৃত সুলতান হাওলাদারের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের অংশ হিসেবে চাঁদপুর নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের একটি দল মেঘনা নদীতে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় জেলেদের সঙ্গে অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। তবে গুলিবর্ষণের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং কার গুলিতে জেলের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহতের বোনের অভিযোগ, গুলিতে প্রাণ গেছে ভাইয়ের।
নিহত জেলের বোন সাথী আক্তার অভিযোগ করে বলেন, তাঁর ভাই আক্তার হাওলাদার রাতে মেঘনা নদীতে মাছ শিকারে যান। এ সময় চাঁদপুর নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা অতর্কিত গুলি চালালে তাঁর ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
পরে তাঁকে উদ্ধার করে হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে বরিশালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সাথী আক্তার আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ করবেন না। তারা নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত ও চান না।
চাঁদপুর নৌপুলিশের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
এদিকে, এ ঘটনার পর চাঁদপুর নৌপুলিশের বিরুদ্ধে মেঘনা নদীতে অভিযান পরিচালনার নামে হিজলা উপজেলায় ঢুকে জেলেদের হয়রানি, ট্রলার জব্দ এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় আটককৃত ট্রলার ছাড়িয়ে আনতে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে চাঁদপুর নৌপুলিশকে ।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, চাঁদপুর নৌপুলিশের সদস্যরা প্রায়ই হিজলা উপজেলার মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় জেলেদের মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা আটক করে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়।
এছাড়া জেলেদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং ডাকাতির মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন জেলে।
তবে এসব অভিযোগে অস্বীকার করেছেন চাঁদপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ দুলাল ইকবাল। তিনি বলেন, আমরা গতকাল রাতে মেঘনা নদীতে কোনো অভিযান পরিচালনা করিনি। চাঁদপুরের কোস্টগার্ডের সাথে যোগাযোগ চেষ্টা করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযানে থাকার অভিযোগ অস্বীকার হিজলা নৌপুলিশের।
এদিকে, ঘটনার সময় হিজলা নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠলেও ফাঁড়ির ইনচার্জ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হিজলা নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এছিনুল হক জানান, তাঁদের ফাঁড়ির কোনো সদস্য ওই অভিযানে অংশ নেননি।
অন্যদিকে, হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস সিকদার জানান, হিজলা উপজেলার নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, তাঁরা এই অভিযানে ছিলেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ঘটনায় জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক।
মেঘনা নদীতে অভিযানকালে গুলিতে জেলের মৃত্যুর পরে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অভিযানের নামে ট্রলার জব্দ, অর্থ আদায় এবং জেলেদের হয়রানির অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনায় একজন জেলেকে চাঁদপুর নৌপুলিশ আটক করেছে বলেও জানা গেছে। তবে আটক ব্যক্তির পরিচয় ও আটকের কারণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে, নিহতের পরিবার কোনো অভিযোগ করতে না চাইলেও গুলিবর্ষণের প্রকৃত কারণ, অভিযানে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের ভূমিকা এবং জেলেদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে ।