
নগরের বুকে একের পর এক মাথা তুলছে বহুতল ভবন। কোথাও ভবনের গা ঘেঁষে উঠছে আরেকটি স্থাপনা, কোথাও নেই নির্ধারিত খালি জায়গা, আবার কোথাও অনুমোদিত নকশার বাইরে বাড়ানো হচ্ছে ভবনের তলা। বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন এসব স্থাপনার ভেতরে নির্মাণবিধি কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, নগরে নির্মিত স্থাপনাগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা হচ্ছে না ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬’। ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত নগরীতে ভবনের নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নির্মাণে অনিয়ম, ত্রুটিপূর্ণ ভিত্তি, অপর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা এবং অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের প্রবণতা ভবনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকা বরিশালে এ ধরনের অনিয়ম বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ভবনের নকশা অনুমোদনের পর নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।
নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ভবনের চারপাশে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জায়গা রাখা হয়নি। কোথাও অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের মিল নেই। আবার কোথাও যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে শুধু ভবনের নিজস্ব নিরাপত্তাই নয়, আশপাশের স্থাপনা ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় মাসে নগরে ১ হাজার ৪০০টি নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বহুতল ভবন ২৭টি। ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরে মোট হোল্ডিং ৫৮ হাজার। এর মধ্যে ৪১ হাজার পাকা ভবন বা স্থাপনা। বহুতল ভবনের সংখ্যা আড়াই শতাধিক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নকশা অনুমোদনের সময় নিয়ম অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও নির্মাণকাজ চলাকালে সেই শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এ সুযোগে কোনো কোনো ভবন মালিক অনুমোদিত নকশা থেকে সরে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো তলা ও ভবনের আয়তন বাড়াচ্ছেন। ফলে কাগজে-কলমে অনুমোদিত নকশা আর বাস্তবে নির্মিত ভবনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ব্যবধান।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্থপতি মো. সাইদুর রহমান লুসান বলেন, অনেক ভবন মালিক প্রথম তলার নির্মাণকাজ শেষ করার পর অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করেন। ভবনের চারপাশে নির্ধারিত জায়গাও রাখা হয় না। এতে ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হতে পারে এবং ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নির্মাণবিধি উপেক্ষা করে ভবন তৈরির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে অতীতে ভবন হেলে পড়ার ঘটনাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বেলতলা, বাংলাবাজার ও সদর রোডসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় মৃদু ভূমিকম্পের সময় অন্তত আটটি ভবন হেলে পড়েছে। এসব ঘটনা নগরের ভবনগুলোর কাঠামোগত সক্ষমতা ও নির্মাণমান যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আতিকুল হক ফারাজী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বরিশাল ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে। এ অঞ্চলের মাটির গঠন বিবেচনা না করে এবং পাইলিংয়ে ত্রুটি রেখে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
তাঁর মতে, ভবন নির্মাণের আগে মাটির বৈশিষ্ট্য, ভিত্তির সক্ষমতা ও প্রকৌশলগত নকশা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা থাকলে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মিলন মণ্ডল বলেন, একটি পরিকল্পিত ও নিরাপদ নগর গড়ে তুলতে শুধু মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করলেই হবে না। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ভবনের আয়তন বা তলা বাড়ালে মূল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ভবনের ভিত্তি অতিরিক্ত ভার বহনের উপযোগী না হলে কাঠামো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ার পাশাপাশি ভূমিকম্প বা ঝড়ের মতো পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ে।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের সিনিয়র প্ল্যানার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আইন না মেনে ভবন নির্মাণের প্রবণতা বরিশালকে অপরিকল্পিত কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত করছে। এভাবে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।