
বরগুনা প্রতিনিধি,
“আমার নামে নিউজ করেন, আমি পাঁচ বছর হলো বরগুনায় আছি—যেতে চাই কিন্তু যেতে পারছি না। পাঁচ বছরে বরগুনায় থেকে অনেক ইতিহাস সৃষ্টি করলাম, কিন্তু বরগুনা ছাড়তে পারলাম না।”
মজার ছলে এভাবেই নিজের অফিস কক্ষে বলছিলেন বরগুনার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন।
এরপর হঠাৎই তিনি ঐ বিষয়ে নিউজ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বরগুনার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
জানা গেছে, বরগুনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অফিসের তৃতীয় তলার প্রশিক্ষণ কক্ষের পাশে সংসার গড়ে তুলেছেন।
সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি সত্যিই অফিসেই বসবাস করছেন।
তবে তিনি দাবি করেন—“আমার সহকর্মীরা অল্প বেতন পান, তাই এখানে থাকেন। এছাড়া এত বড় অফিস পাহারা দিতেও লোক দরকার।”
এ সময় দেখা যায়, তৃতীয় তলায় তিনটি কক্ষ তিনি নিজ ব্যবহারে রেখেছেন।
বছরের পর বছর দখল করে রেখেছেন গেস্টরুম।
দুটি রুম দিয়েছেন সহকারী পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম ও অসিত বাবুর কাছে।
তার সঙ্গে বসবাস করতেন প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম।
সরকারি অফিসে স্ত্রীকে নিয়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,
“আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানিয়েই থাকছি।”
অন্যদের বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকারি চাকরি করে কতই বা বেতন পায়—তাই এখানেই থাকে।”
অভিযোগ রয়েছে, বরগুনা সদর উপজেলার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের একটি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এক প্রবাসীর স্ত্রী লাভলী আক্তার নিপার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন শিক্ষা কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন।
লাভলী আক্তার নিপা বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্যের বোনের মেয়ে।
পরে প্রবাসী স্বামীকে তালাক দিয়ে ২০২২ সালের ২৫ জুন ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে জসিম উদ্দিনকে বিয়ে করেন নিপা।
তবে সে সময় তিনি নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন।
প্রথম স্ত্রী বিয়ের খবর জানার পর শুরু হয় পারিবারিক দ্বন্দ্ব।
পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে জসিম উদ্দিন পুনরায় নিপার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন।
এতে বিরোধ দেখা দিলে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ৯১ লাখ টাকা দেনমোহরে আবারও বিয়ে করেন নিপাকে।
এরপর কখনো নিপার বাসায়, কখনো অফিসের গেস্টরুমে বসবাস করতে থাকেন তারা।
পরবর্তীতে প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জেনে চাপে ফেলে তাকে নিপাকে তালাক দিতে বাধ্য করেন।
এমনকি গত ২ অক্টোবর প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম স্বামীকে নিয়ে নিপার বাসায় গিয়ে হুমকি প্রদান করেন।
এতে অসুস্থ হয়ে নিপা বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন।
পরে খোরপোশ দাবিতে তিনি জেলা জজ কোর্টে মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, শিক্ষা কর্মকর্তার অফিস দখল ও বসবাসের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক।
সেই পোস্টের বরাত দিয়ে ৩০ অক্টোবর বৈশাখ টেলিভিশনের বরগুনা প্রতিনিধি রাসেল শিকদার, এ ওয়ান টিভির প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন রাজুসহ অজ্ঞাত আরও দুজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন জসিম উদ্দিন।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে বরগুনা সদর থানার ওসি-কে ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এরপর ২ নভেম্বর ওসি মো. ইয়াকুব হোসাইন আদালতের নির্দেশে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রুজু করেন।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর কেন্দ্রীয় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর, বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর কবির মৃধা ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান তাপস।
তারা এক বিবৃতিতে বলেন—“সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।”
তারা অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনের অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি।
ফোনে তিনি জানান—“অফিসের কাজে বাইরে আছি।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,
“অনেক অফিসেই এখন থাকার ব্যবস্থা থাকে।
তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে থাকার কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা আমি জানি না।
আপনাদের মাধ্যমে জানলাম, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।”