
পটুয়াখালী প্রতিনিধি :
পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন আবাসন ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো দীর্ঘ দিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে ২০০৩ সালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার পশ্চিম কালিকাপুর আবাসন প্রকল্পে ঠাঁই পেয়েছিলেন ৮৫ বছর বয়সী রাবেয়া বেগম। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও টিনের চালা মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় এখন সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। শুধু রাবেয়া বেগমই নন, জেলার ৭৪টি আবাসন প্রকল্পের হাজারো গৃহহীন ও অসহায় পরিবার এখন একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি।
সরেজমিনে বিভিন্ন আবাসন ও আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ টিনের ব্যারাকের অবস্থাই নাজুক। পুরনো টিনে মরিচা পড়ে অনেক জায়গায় ছিদ্র হয়েছে। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পলিথিন, প্লাস্টিকের চট কিংবা পুরনো টিন দিয়ে চালা ঢাকার চেষ্টা করছেন। কোথাও ছিদ্রের ওপর ইট চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে এসব অস্থায়ী ব্যবস্থা বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। মেঝেতে পানি জমে যায়। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় বাসিন্দাদের।
রাবেয়া বেগম বলেন, বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। টিন দিয়ে পানি আটকানো যায় না। অনেক কষ্ট করে এখানে থাকি। সরকার যদি ঘরটা মেরামত করে দিত, তাহলে বাকি জীবনটা একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম।
রাবেয়ার মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন জেলার বিভিন্ন আবাসন ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় অনেক প্রকল্পের ঘর এখন জরাজীর্ণ। কোথাও টিনের চালা নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও দেয়াল ও দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত। আবার অনেক প্রকল্পে শৌচাগার, গোসলখানা ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যবহার উপযোগী নেই বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
ফারুক নামে একজন বাসিন্দা বলেন, ঘর পাওয়ার সময় আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু অনেক বছর হয়ে গেছে, ঘরের টিন আর ঠিক নেই। বৃষ্টি হলে ঘরে থাকা যায় না। নিজেরা যতটুকু পারি পলিথিন দিয়ে আটকাই। কিন্তু সব জায়গা তো আটকানো সম্ভব হয় না।
রফিক নামে আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, শুধু বৃষ্টির সময় নয়, শীতের সময়ও কষ্ট হয়। টিনের ঘর হওয়ায় ঠাণ্ডা বেশি লাগে। দরজা-জানালার অবস্থাও ভালো নয়। আমরা চাই সরকার অন্তত ঘরগুলো একবার ভালোভাবে মেরামত করে দিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কাঁকড়াবুনিয়া ইউনিয়নের কাঁকড়াবুনিয়া বাজারসংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ভিকাখালী আশ্রয়ণ প্রকল্প ১৯৯৯ সালে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয়। এরপর ২০০৯ সালে মসজিদবাড়িয়া ইউনিয়নের তারাবুনিয়া ও ভাসন্ডা, দেউলী, কপালভেড়া এবং রামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পগুলোতে মসজিদ, কবরস্থান, সমবায় সমিতির কার্যালয়সহ টিনের ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি ব্যারাকে রয়েছে ১০টি করে কক্ষ। আবাসিক জমিসহ ভূমিহীন পরিবারকে একটি করে কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়। ১০টি পরিবারের জন্য ছিল চারটি শৌচাগার ও দুটি গোসলখানা। প্রতিটি ব্যারাকের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল একটি করে গভীর নলকূপ।
প্রকল্পগুলো নির্মাণের সময় ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের জন্য এগুলো ছিল বড় ধরনের আশার জায়গা। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এখন অনেক প্রকল্পের অবকাঠামো নষ্ট হয়ে পড়েছে।
সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন, গৃহহীন ও অসহায় পরিবারকে একটি নিরাপদ আবাসন দেয়া। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রকল্পের ঘরগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয় হয়েছে। উপকূলীয় জেলা হওয়ায় লবণাক্ততা, বৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবেও টিনের ঘর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
পশ্চিম কালিকাপুর আবাসন প্রকল্পের আলমগীর নামে এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের অনেকেরই নিজের জমি বা বাড়ি নেই। এই ঘরটাই আমাদের সব। কিন্তু ঘর যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? সরকার আমাদের থাকার জন্য ঘর দিয়েছে, এখন ঘরটা মেরামত করে দিলে আমরা উপকার পেতাম।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় মোট ৭৪টি আবাসন প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পগুলোর অনেক ঘর দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও টিনের চালা নষ্ট, কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা। অনেক জায়গায় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ফলে সরকারি উদ্যোগে আবাসন পেলেও প্রকল্পের অবকাঠামো টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় অনেক পরিবার আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আবাসন প্রকল্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি ও সংস্কারের বিষয়ে জানতে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, আবাসন প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।