
দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর টোল আদায়ে ৫৩ কোটি টাকার গরমিল, কাঠগড়ায় সওজ প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম
বরিশালের জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারের মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতুর টোল আদায়কে ঘিরে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্ব গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ‘খাস কালেকশন’-এর নামে টোল আদায় করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগে বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর পূর্ববর্তী ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে ইজারা দেওয়ার পরিবর্তে সওজ কর্তৃপক্ষ সরাসরি ‘খাস কালেকশন’ পদ্ধতিতে টোল আদায় শুরু করে। এ সময়ের আদায়কৃত টোলের প্রকৃত পরিমাণ এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইজারা প্রক্রিয়া থেকে খাস কালেকশন
সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পূর্ববর্তী ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ইজারা কার্যকর না হয়ে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সওজ কর্তৃপক্ষ সরাসরি টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ শুরু করে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে টোল আদায়ের সময় প্রকৃত আয় ও সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়।
দিনে আদায় ১৩ লাখের বেশি, জমা দেখানো হয় প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, খাস কালেকশন চলাকালে দোয়ারিকা ও শিকারপুর—দুই সেতু মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকারও বেশি টোল আদায় হয়েছে। বিপরীতে সরকারি কোষাগারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে।
অভিযোগের হিসাব অনুযায়ী—
– মোট আদায়কৃত টোল: প্রায় ৯৫ কোটি টাকা
– সরকারি কোষাগারে জমা: প্রায় ৪২ কোটি টাকা
– গরমিলের অভিযোগ: প্রায় ৫৩ কোটি টাকা
এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কোথায় গেল—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টোল আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমার হিসাবের মধ্যে থাকা এই বিপুল ব্যবধানের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
তবে ৫৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম বা সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি, ব্যাংক হিসাব, টোল আদায়ের রসিদ ও দৈনিক সংগ্রহের হিসাব পর্যালোচনা জরুরি।
সওজের চিঠিতে উঠে এসেছে রাজস্বের বড় ব্যবধান
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে সওজের একটি চিঠিকে ঘিরে। চলতি বছরের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-এর অনুকূলে প্রায় ৮৫ কোটি টাকায় তিন বছরের ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় প্রায় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে হিসাব দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ইজারা মূল্য ৮৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, অভিযোগ অনুযায়ী খাস কালেকশনের পরিবর্তে দ্রুত ইজারা দেওয়া হলে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বাড়তে পারত। এ কারণে দীর্ঘ সময় খাস কালেকশন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকৃত আদায় কত—তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি হিসাবে যে পরিমাণ অর্থের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে টোল আদায়ের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। ফলে প্রকৃত রাজস্ব আদায় নির্ধারণে টোল প্লাজার দৈনিক রসিদ, যানবাহনের সংখ্যা, টোল রেট, ব্যাংক জমার স্লিপ, ক্যাশবুক, হিসাবরক্ষণ নথি এবং ইজারা-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে খাস কালেকশন পরিচালনার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, প্রতিদিনের আদায়কৃত অর্থ কে গ্রহণ করেছেন, কত টাকা কোন ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে এবং সরকারি হিসাবে কত টাকা দেখানো হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
জবাবদিহির মুখে সওজ
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মেজর এম এ জলিলের নামে উৎসর্গীকৃত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সেতুর টোল আদায় নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
৫৩ কোটি টাকা গরমিলের অভিযোগ সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে অভিযোগটি মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও প্রকৃত হিসাব প্রকাশেরও দাবি রয়েছে।
দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর খাস কালেকশন নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি রাজস্বের প্রকৃত হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।