ঐতিহাসিক খাল আজ সংকটে: হিজলায় পুনঃখননের দাবিতে জোরালো কৃষক-প্রশাসন উদ্যোগ

Khan Arif
প্রকাশিত February 27, 2026, 20:04 PM
ঐতিহাসিক খাল আজ সংকটে: হিজলায় পুনঃখননের দাবিতে জোরালো কৃষক-প্রশাসন উদ্যোগ

মোঃ দুলাল সরদার,

বরিশালের হিজলা উপজেলার কাউরিয়া বন্দর থেকে কালিকাপুর (গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন) পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৯–১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি একসময় ছিল এই অঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার মূল ভরসা। ১৯৮০ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হিজলা সফরে এসে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ খালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল সেই উদ্যোগের লক্ষ্য।

২৬ ফেব্রুয়ারি খালটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, কাউরিয়া বন্দর সংলগ্ন সুইস গেটের উভয় পাশে ব্যাপক পলি জমে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ। সুইস গেটটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ। খালের বিভিন্ন অংশ আংশিক ভরাট করে অবৈধ দখল ও স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও খালের প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, ফলে বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে না।

খালটি নরসিংহপুর, পশ্চিম কোড়ালিয়া ও চর নরসিংহপুর হয়ে কালিকাপুর সুইস গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো দৈর্ঘ্যের বড় অংশেই পলি জমে খাল প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি সেচ ব্যবস্থায়।

খালের দুই তীরে স্থাপিত ৩০টির বেশি সেচ পাম্প বর্তমানে কার্যত অচল। ব্লক ম্যানেজার আরিফ হোসেন মৃধা জানান, তাঁর আওতাধীন প্রায় এক হাজার কৃষক পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই তথ্য দিয়েছেন ব্লক ম্যানেজার মনিরুজ্জামান মল্লিক ও সোবহান সরদার। কৃষকদের ভাষ্য, খালে পানি না থাকায় বোরো ধান চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের হিসাবে, প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন কমে গেছে বা ঝুঁকির মুখে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে , এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন।

হিজলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আহসানুল হাবীব আল আজাদ জনি বলেন, গত অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২,২০০ হেক্টর। কিন্তু সময়মতো পানির সংকটে ১,৯০০ হেক্টরে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০০ হেক্টর ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে খাল খনন ও সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে সব খালের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা পাঠানো হবে এবং এই খালটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস শিকদার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খাল সংস্কারের সম্ভাব্য তালিকা চাওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তালিকা চূড়ান্ত করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রেরণ করবে। নির্দেশনা অনুযায়ী খাল খনন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

চার দশকের বেশি আগে যে খালটি কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে উদ্বোধন হয়েছিল, সেটিই আজ পলি ও দখলে সংকুচিত। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় খালটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাল খনন ও সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগে স্থানীয় কৃষক পরিবারগুলো নতুন করে আশাবাদী। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করা গেলে সেচ ব্যবস্থা পুনরায় সচল হবে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং এলাকার কৃষি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

হিজলার এই খালটি শুধু একটি জলপথ নয়; এটি কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অবকাঠামো। কার্যকর পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই পারে ঐতিহাসিক এই খালকে আবারও উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....