
চোখের সামনে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। যে মাটিতে বাবা-ভাই ও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, সেই জমিই এখন সন্ধ্যা নদীর গর্ভে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলেও থামানো যায়নি ভাঙন। সব হারানোর শঙ্কায় কেউ ছুটছেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে, কেউ আবার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নদীপাড়ে শনিবার দুপুরে এমনই এক দৃশ্য দেখা যায়।
অসুস্থ হোসেন প্যাদার স্ত্রী নাজমা বেগম নদীর তীরে বসে দুই হাত তুলে প্রার্থনা করছিলেন। সঙ্গে ছিল পান-সুপারি, মিষ্টি ও ফল।
নাজমা বেগমের বিশ্বাস, নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে এভাবে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি বিশ্বাসের কথা শুনেই তিনি এসব নিয়ে নদীর পাড়ে বসেছেন বলে জানান।
নাজমা বলেন, আল্লাহ ছাড়া এই ভাঙন কেউ ফিরাতে পারবে না। আমি স্বপ্নে দেখেছি নদীর তীরে প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইলে নদী ভাঙন ফিরবে।
তার এই বিশ্বাসকে কেউ কল্পকাহিনি হিসেবে দেখলেও নদীর ভাঙন থামাতে স্থানীয়দের আকুতি ও উদ্বেগে কোনো কমতি নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে দেহেরগতি ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সন্ধ্যা নদীর তীরে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর পাড় ভাঙছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে গাছপালা, ফসলি জমিসহ কয়েক একর জায়গা। ভাঙনের মুখে রয়েছে ইদিলকাঠী থেকে বাহেরচর এলাকার সংযোগ সড়কটিও।
স্থানীয়রা বলছেন, সড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে ওই এলাকার শত শত পরিবার যোগাযোগ সংকটে পড়বে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিনই নতুন করে ভাঙছে পাড়। কখন কারও ঘর, জমি কিংবা বসতভিটা নদীতে চলে যায়- এ নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মোল্লার কণ্ঠেও হতাশা।
তিনি বলেন, চোখে এখন আর জল আসে না। চোখের সামনেই সব নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন বাপ-দাদার বসতবাড়ি ও কবরস্থানও যাচ্ছে। নিজের কবর দেওয়ার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না।
তার মতোই নদীপাড়ের শত শত মানুষের আশঙ্কা করছেন যে- ভাঙন ঠেকানো না গেলে শুধু জমি নয়, বসতভিটা ও যোগাযোগব্যবস্থাও হারিয়ে যাবে।
শনিবার(৩ অক্টোবর) দুপুরে ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা নদীভাঙন প্রতিরোধে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবিতে মানববন্ধন করেন। এতে নদীপাড়ের শত শত মানুষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত উদ্দিন বলেন, আমরা নদীভাঙন প্রতিরোধ চাই। এই ইউনিয়নটি নদীবেষ্টিত। আমরা বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন স্যারের কাছে ভাঙনের অবস্থা জানাব। অবশ্যই তিনি একটি ব্যবস্থা করবেন।
স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইদিলকাঠী-বাহেরচর সংযোগ সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তাই জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান শুভ বলেন, সন্ধ্যা নদীর ভাঙন তীব্র হওয়ার বিষয়টি শুনেছি। ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।