
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় রপ্তানি আয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিরতির পর সোমবার (২ নভেম্বর) পর্যন্ত টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ চলে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, মহাসড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে রাজধানীর আশপাশের গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার ৭০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকপক্ষ।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক মো. হাসিব উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, দেশের পোশাকশিল্প থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় হয়। বছরে গড়ে ৩৪০ দিন কারখানা চালু থাকে। সেই হিসাবে এক দিনের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন বন্ধ থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১ বিলিয়ন ডলারের পরিচালন ও আর্থিক ক্ষতির প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৭০০ রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রমেও পড়বে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ইমপ্রেস-নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেডের পরিচালক নাফিস-উদ-দৌলা গণমাধ্যমকে বলেন, আগামী সপ্তাহে তাদের ১ লাখ ৪০ হাজার পিস পোশাক সরবরাহের কথা রয়েছে। কিন্তু চলমান অস্থিরতার কারণে নির্ধারিত সময়ে এসব পণ্য উৎপাদন ও পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) কারখানা চালু হলেও সময়মতো উৎপাদন শেষ করা কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে অন্য অর্ডারগুলো ঠিক রাখতে তিনি ওই অর্ডারটির পেছনে না ছোটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়া নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে, সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশে পোশাকের অর্ডার দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভারত সুবিধা পেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশটি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে চলমান আলোচনা দ্রুত শেষ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নাজমা আক্তার।